মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়াদের মধ্যে এ পর্যন্ত সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এদিকে, রাখাইনে এখনো যেসব রোহিঙ্গা রয়েছেন, তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করতে নতুন করে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার ও তার আগের দিনও রাখাইনের আকাশে আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার কুণ্ডলি প্রত্যক্ষ করেছেন টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল ও হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকার সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। এ ঘটনায় সীমান্তের এপারের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি অস্থায়ী কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের কাজ এগিয়ে চলছে। সাতটি ক্যাম্পের মাধ্যমে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে চলমান এ নিবন্ধনের কাজ করছে সরকরের পাসপোর্ট অধিদফতর। মঙ্গলবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ৭ লাখ ৪৯ হাজার ৮৬০ জনের নিবন্ধন করা হয়েছে। সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, শুধু মঙ্গলবার কুতুপালং-১ ক্যাম্পে নারী-পুরুষ মিলে ৩০১, কুতুপালং-২ ক্যাম্পে ১ হাজার ৯৬, নোয়াপাড়া ক্যাম্পে ১ হাজার ২৩৬, থাইংখালী-১ ক্যাম্পে ২ হাজার ৪০, থাইংখালী-২ ক্যাম্পে ৪২৫, বালুখালী ক্যাম্পে ১ হাজার ৯১৩, শামলাপুর ক্যাম্পে ৪০ জন এবং পরের দিনে ৭টি কেন্দ্রে মোট ৭ হাজার ৫১ জনের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়েছে। এ ছাড়া সমাজসেবা অধিদফতর এ পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৩৭৩ জন এতিম রোহিঙ্গা শিশুকে শনাক্ত করেছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৫ আগস্টের পর থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের নাগরিকের সংখ্যা ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৬৭০ জন। অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকায় এ সংখ্যা বাড়ছে বলেও সরকারি তথ্য বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমার নাগরিকদের জন্য মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে বেসরকারি উৎস থেকে প্রাপ্ত ত্রাণ সরকারি উদ্যোগে বিতরণ অব্যাহত আছে বলেও তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়।

এদিকে, রাখাইন রাজ্যে এখনো যেসব রোহিঙ্গা রয়েছেন, তাদের ঘরছাড়া ও দেশত্যাগে বাধ্য করতে দেশটির সেনাবাহিনী নতুন করে অভিযান শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযানের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীর সহায়তায় স্থানীয় রাখাইন ও মগরা রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামে অবশিষ্ট ঘরবাড়িগুলোও আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে। গত সোম ও মঙ্গলবার রাখাইনের মংডুর কুমিরখালী ও নাকমুড়াপাড়া গ্রামে ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সদ্য অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা। কুমিরখালী গ্রামে থেকে পালিয়ে এসে বুধবার টেকনাফের হোয়াইক্যং পুথিন পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন মোহাম্মদ আকবর। তিনি জানান, সোমবার বিকেলে হঠাৎ করেই সেনাবাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় রাখাইনরা মিলে কুমিরখালী গ্রামে থাকা রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতদিন ওইসব গ্রামের বাসিন্দারা দালালদের মাধ্যমে মাসোহারা দিয়ে কোনো রকম বসবাস করছিলাম। বর্তমানে তাদের ঘরবাড়িও আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে সেনাবাহিনী। সোমবার তাদের গ্রামের পাঁচটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে তার একটি কাঠের বাড়িও রয়েছে।

গত এক মাস আগে কক্সবাজারে পালিয়ে এসেছেন রশিদ আহমদ। তিনি বলেন, কুমিরখালীতে আগুনের শিখা দেখে ওপারের উক্কাটা (চেয়ারম্যান) মোহাম্মদ কামালের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলি। মঙ্গলবার মিয়ানমারের একদল সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে কুমিরখালীর বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে তিনি জানান।

মংডু টাউনশিপের নাকপুরা পাড়া গ্রামের মো. আজিজ বলেন, ওই দেশে আমাদের জন্ম। কিন্তু সেখানে আমাদের ঠাঁই হয়নি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। হয়তো সেখানে থাকলে ঘরবাড়ির মতো আমাদেরও আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো।

তিনি আরো বলেন, সোমবার সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে রাখাইনরা আমাদের কাঠের দোতলা ঘরটি পুড়িয়ে দিয়েছে। ওই গ্রামের মেন বাজারে দুটি কাপড়ের দোকান ছিল, সেগুলো ভেঙে দিয়েছে তারা।

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা আবদুল মতলব জানান, সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় রাখাইনরা সেখানে রোহিঙ্গাদের অবশিষ্ট বাড়িঘরগুলোও জ্বালিয়ে দিচ্ছে। সোমবার বিকেলে মংডুর কুমিরখালী ও নাকপুরা গ্রামে প্রায় ১০টির মতো ঘরবাড়ি আগুনে ছাই করে দিয়েছে তারা।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক বলেন, সীমান্তের ওপারে অনেক দিন আগুনের ধোঁয়ার খবর পাওয়া যায়নি। হঠাৎ করে সোম ও মঙ্গলবার রাখাইনে আবারো ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখা গেছে বলে স্থানীয় লোকজনের কাছে শুনেছি। প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। তাদের মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ প্রদান করে রোহিঙ্গা শিবিরে পাঠানো হচ্ছে।

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here